Mahisasuramardini: মহিষাসুরমর্দিনী কলকাতা বেতারের শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য – looking back at the creation of iconic radio show mahisasuramardini on the onset of devipaksha

নৃসিংহকুমার ভট্টাচার্য

১৯২৮ সালে টাঁকশালের স্থায়ী চাকরি ছেড়ে কোনও দিকে না তাকিয়ে তাঁর পছন্দের বেতার কেন্দ্রের কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। মনে হয় নিজের ‘বাণীকুমার’ ছদ্মনামটিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যেই তাঁর এই প্রতিষ্ঠা। মহিষাসুরমর্দিনী বাণীকুমারের প্রথম যৌবনের রচনা। ‘এই রচনাশৈলটিকে মার্কন্ডেয় সপ্তশতী চণ্ডীর সংক্ষিপ্তসার বললেও অত্যুক্তি হয় না। তদুপরি এর মধ্যে আছে মহাশক্তি-সম্বন্ধে বৈদিক ও তান্ত্রিক ভারতের মর্মকথা। সেই জন্য এই বিষয়বস্তু যে রূপে সর্বজনের বোধগম্য ও মর্মস্পর্শী হয়, যথাসম্ভব সে চেষ্টার বিরাম রাখি নাই।’ —এই কথাগুলি বাণীকুমারের লেখা থেকে উদ্ধৃত।

মহিষাসুরমর্দিনীর উৎপত্তি ও প্রচার কলকাতা বেতার প্রতিষ্ঠান আকাশবাণী থেকে। ১৯৩২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ৮৭ বছর শুধু এক বছর অর্থাৎ এমারজেন্সির সময় দেবীং দুর্গতি হারিনির্ম নামে একটি গীতিআলেখ্য হয় যা একবারই মহালয়ার দিন সকাল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত হয়— যা কিন্তু সাধারণ মানুষ সেই অনুষ্ঠানটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। আবার ১৯৭৭ সালে ফিরে এসেছে বাণীকুমারের রচনা ও প্রবর্তনা। সঙ্গীত সর্জন পঙ্কজকুমার মল্লিক, গ্রন্থনা স্তোত্র-পাঠ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।

আবার ফিরে আসি এই অনুষ্ঠানটির শুরুর কাহিনিতে। ১৩৩৮ বঙ্গাব্দের (১৯৩২) খ্রিস্টাব্দের চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমীর প্রভাতে বাসন্তী ও অন্নপূর্ণা পুজোর সন্ধিক্ষণে যে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হয় ‘বসন্তেশ্বরী’ নামে একটি চম্পু শ্রীশ্রী মার্কন্ডেয় চণ্ডীর বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে বাণীকুমার লিখে ফেললেন। তখন বেতার কেন্দ্রের নতুন নামকরণ হয়েছে ‘ইন্ডিয়ান স্টেট ব্রডকাস্টিং সার্ভিস’। তখন সকলেই নব নব অনুষ্ঠান সাজাতে ব্যস্ত। এরই ফলে জন্ম নিল ‘বেতার-বিচিত্রা’ রচনা থেকে পরিচালনার সম্পূর্ণ ভার বাণীকুমারের উপরেই ন্যস্ত হল। আগেই লিখেছি এই সৃজনশীল মানুষটি বিভিন্ন স্বাদের ডালি সাজিয়ে ফেললেন, তার প্রথম ডালিটি হচ্ছে বসন্তেশ্বরী। সঙ্গীত পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র বালীর সুর-সর্জনে রাগ বসন্ত এবং দেশী, দেবগিরি, বরাটী, তোড়ী, ললিতা ও হিন্দোলী— এই ছয় রাগিনী বাণী-সংযোগে এক অপূর্ব রসের সঞ্চার হয়। পঙ্কজকুমার মল্লিক অন্যান্য গানের সুর দেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কয়েকটি নাট্য-কথা সূত্র ও গীতাংশ পাঠ করেন এবং বাণীকুমার শ্রীশ্রীচণ্ডীর কতিপয় শ্লোক আবৃত্তি করেন। রাইচাঁদ বড়ালের সঙ্গীত পরিচালনায় ও বাণীকুমারের প্রবর্তনায় অনুষ্ঠানটি রসোর্ত্তীর্ণ হয়। এই অনুষ্ঠানটিই হচ্ছে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ পরিকল্পনার উৎস।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা যা শুনেছি বাণীকুমারের কাছ থেকে তা এখানে তুলে ধরছি। এই বসন্তেশ্বরী অনুষ্ঠানটি রসোত্তীর্ণের কিছু দিন বাদে বাণীকুমার তৎকালীন বেতার অধিকর্তা শ্রীনৃপেন্দ্রনাথ মজুমদারের কাছে গিয়ে ১৯৩২-এর মহাষষ্ঠীর (আশ্বিন ১৩৩৯) শারদীয়া বন্দনা করার বাসনা রাখেন। উনি পর পর এই অনুষ্ঠান শ্রোতারা গ্রহণ করবে না বলে এই অনুষ্ঠানটি করতে আগ্রহী ছিলেন না। এই রকম আলোচনা যখন চলছে তখন বেতার জগতের সম্পাদক প্রেমাঙ্কশু আতর্থী এসে বাণীকুমারের এই প্রস্তাব সমর্থন করেন এবং নৃপেন্দ্রনাথের সঙ্গে কথা কয়ে এই অনুষ্ঠান ওই নির্দিষ্ট দিনেই মহাষষ্ঠীর নবপ্রভাতে বাণীকুমারের রচিত ‘শারদীয়া বন্দনা’ তাঁরই প্রবর্তনা, পঙ্কজকুমার মল্লিকের সঙ্গীত পরিচালনা এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গ্রন্থনা ও স্তোত্র পাঠে প্রচারিত হল এবং পাঠকদের মন জয় করল। ১৯৩৩, ১৯৩৪— এই তিন বছর পরিমার্জিত হতে থাকে স্ক্রিপ্ট ওই একই নামে প্রচারিতও হতে হতে থাকে। তার পর ১৯৩৬ মহিষাসুর বধ ঠিক পরের বছর ১৯৩৭ থেকে মহিষাসুরমর্দিনী নামকরণ হয়।

এইবার বাণীকুমারের কথা শোনা যাক— ‘মহিষাসুরমর্দিনী সম্পর্কে সহৃদয় গ্রাহকগণের অবগতির জন্য উল্লেখ করা আবশ্যক যে, বৎসরে বৎসরে না হোক্— এই মহিষাসুরমর্দিনী আলোখ্যটিকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করবার আগ্রহে আমি বিবিধ বিষয়, স্তব-স্তুতি, দেবীসুক্ত, নব-রচিত গান সন্নিবেশ করেছি। অন্ততঃ ছয়-সাত বার এই রচনার পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। মহাদেবীর চণ্ডিকার প্রায় সমূহ তত্ত্ব ও তথ্য সমাহারে এবং দেবীর নানাবিধ ভাব-রূপ-প্রকাশক গীতাবলী-সজ্জায় এই ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সুসম্পন্না হয়ে উঠেছে।’

এই বিশেষ প্রভাতী অনুষ্ঠানটির ঘোষণার বয়ানটিও বাণীকুমারের।

মহিষাসুরমর্দিনী-রচনা ও প্রবর্তনা— বাণীকুমার

সঙ্গীত-সর্জন— পঙ্কজকুমার মল্লিক

গ্রন্থনা ও স্তোত্রপাঠ— বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র

সঙ্গীতবীথি— মহিষাসুরমর্দিনী

আজ দেবীপক্ষের প্রাকপ্রত্যুষে জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতা মহাশক্তির শুভ-আগমনবার্তা আকাশে-বাতাসে বিঘোষিত। মহাদেবীর পুণ্য স্তবন-মন্ত্রে মানবলোকে জাগরিত হোক ভূমানন্দের অপূর্ব প্রেরণা। আজ শারদ গগনে-গগনে দেবী ঊষা ঘোষণা করছেন মহাশক্তির শুভ আবির্ভাবক্ষণ। সেকালের বড় বাজিয়েরা এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলেন সারেঙ্গিতে মুন্সি, চেলো তাঁর ভাই আলি, হারমোনিয়াম খুশি মহম্মদ, বেহালা তারকনাথ দে, ম্যান্ডোলিন সুরেন পাল, গিটার সুজিত নাথ, এসরাজ দক্ষিণামোহন ঠাকুর, ডবল বাস শান্তি ঘোষ, বেহালা অবণী মুখোপাধ্যায়, পিয়ানো রাইচাঁদ বড়াল। এ ছাড়া তবলা ও অন্য আরও কিছু যন্ত্রের শিল্পী যুক্ত ছিলেন। প্রধান গায়ক পঙ্কজ মল্লিক, কৃষ্ণ ঘোষ, আভাবতী, মানিকমালা, প্রফুল্লবালা, বীণাপানি, প্রভাবতি ও তখনকার দিনে শ্রেষ্ঠ গায়ক-গায়িকা ছিলেন তাঁরা একক ও কোরাসে অংশগ্রহণ করলেন। পরবর্তীকালে চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাটের দশকের বাংলার প্রায় সমস্ত খ্যাতমানা শিল্পীরাই এই মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। সেই সব নাম প্রতি বছর অনুষ্ঠানের শেষে ঘোষক বলে থাকেন।

সারা ভারতে ৩৫টি বেতার কেন্দ্র থেকে মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হত। সর্বধর্ম ও ভাষার মানুষের প্রাণের আরাম ও মনের তৃপ্তি হিসাবে পরিগণিত। সেই অনুষ্ঠানেও রক্ষণশীলদের প্রথম প্রশ্ন উঠেছিল কায়স্থের চণ্ডীপাঠ নিয়ে। ঠিক একই প্রশ্ন মুসলমান শিল্পীদের অনুষ্ঠানে যোগদান নিয়ে। মহালয়ার দিন ৪টে থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত অর্থাৎ পিতৃতর্পণের সময় নিয়ে প্রশ্ন।

বাণীকুমার এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন এবং শ্রোতাদের এই অনুষ্ঠান এমনই মুগ্ধ করল এক ধাক্কায় সব শান্ত হয়ে গেল। জনসাধারণের কাছ থেকে অভিনন্দনের পর অভিনন্দন আসতে লাগল। এই অনুষ্ঠান অতি পরিচিত হয়েও বৎসরান্তে একটি শারদ ঊষার প্রাক্কালে এই অনুষ্ঠানটি লক্ষ লক্ষ শ্রোতার মনকে আজও ভরিয়ে তোলে। এই মহাশক্তি-বন্দনার শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে গেছে।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

India’s first contactless payment watch is here!, BFSI News, ET BFSI

Thu Sep 17 , 2020
On Wednesday, SBI announced its collaboration with Titan that led to the development of India’s first contactless payment watch, Titan Pay. This comes after SBI’s statement, “The new normal has enforced upon an urgent need to bring about innovative & safer purchase solutions in the retail space.” How the watch […]

You May Like

Breaking News

Recent Posts