টুমুনি, কাঁসাই ও ‘২৪ ঘণ্টা’র গল্প

অরিন্দম চক্রবর্তী নীল

আজ থেকে প্রায় একমাস আগে একটা ফোন এসেছিল। 

-নীলদা শুনেছ, অঞ্জন’দা হাসপাতলে ভর্তি!
 -কেন?

– কোভিড!

– সেকি? খবরটা ঠিক তো?
সঙ্গে সঙ্গেই দুটো ফোন করি! জুঁই’য়ের (অদিতি বন্দ্যোপাধ্যায়) ফোনটা পেলাম না! মৌপিয়া’কে (মৌপিয়া নন্দী) পেলাম।

– কিরে কী শুনছি?

– আর বোলো না নীলদা! আমি পইপই করে নর্থ বেঙ্গল যেতে বারণ করেছিলাম। শুনল না। 
কী যে করি! কিছুই ভালো লাগছে না! 

কিছু কার্যকারণ সম্পর্কে অঞ্জনের সঙ্গে আমার প্রায় আট মাস কথা হয়নি। শেষ দেখা, বাইপাসের ধারে এক হাসপাতালে। তা-ও প্রায় বছরখানেক আগে। মাসিমা (অঞ্জনের মা), আর আমার মা– দুজনেই পাঁচতলায় পাশাপাশি কেবিনে ভর্তি। টানা প্রায় দু’সপ্তাহ আমরা সকাল-বিকেল গেছি। আমাদের দেখা হয়নি। শেষমেশ যেদিন আমি মাকে রিলিজ করাতে গেছি, হঠাৎই দেখি রিসেপশনের সামনে অঞ্জন! আহ, কতদিন পরে দেখা!
-কী রে তুই এখানে?
 
-তুই! 
-মা ভর্তি। 

-আমার মা’ও!

-তাই! কোথায়?

-এই তো পাশের কেবিনে।

দরজা খুলে ঢুকলাম। সামনেই আধশোয়া অঞ্জনের রত্নগর্ভা মা। ব্যাধির দৈন্য মুখের উজ্জ্বল হাসিটুকু মুছে ফেলতে পারেনি। অদ্ভুত এক স্নিগ্ধতা মনকে ছুঁয়ে ফেলে অনায়াসেই।

– মা! নীল! 

প্রণাম করলাম। বললাম, কেমন আছেন মাসিমা! 

-এখন ভালো আছি! 
মা’রা যেমন বলেন আর কি! আমি একবার ওঁর দিকে তাকালাম। একবার অঞ্জনের দিকে। কী অপার নির্ভার নির্ভরতা! অঞ্জনও তার নিজ-গুণে বিখ্যাত দাদার নিরলস প্রেরণাস্রোত! আরও কিছু কথা হল। বললাম, আমার মা’ও এখানে ছিলেন। এখন আপাতত সুস্থ! তাই আজ বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছি। 
আমি উঠলাম,বললাম, আপনিও তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন। এভাবে শুয়ে থাকলে হয়! বাড়ি ফিরতে হবে তো! উনি মিষ্টি করে হাসলেন। এমন হাসি, যা শুধুমাত্র মায়েরাই হাসতে পারেন!

আরও পড়ুন: সঞ্চালক অঞ্জনদা কখনোই নিজের মত কারও উপর চাপিয়ে দিতেন না, সকলকে বলার সুযোগ দিতেন

এবার অঞ্জনের পালা।

-মা, কে এসেছে দেখো!

– অঞ্জন! এসো বাবা! 
ও প্রণাম করলো!

– ভালো থেকো বাবা! বৌমা, মেয়ে  সব ভালো আছে তো!

আমি একটু দূর থেকে দেখছিলাম মায়ে- পোয়ের কথোপকথন। কত অনায়াস একটা সহজ সম্পর্ক। এবার ওঠার পালা! অঞ্জন বলল, মাসিমা একটু শক্ত হতে হবে তো! ছেলের জন্য এত চিন্তা করলে হয়! মা একবার আমার দিকে তাকালেন, একবার অঞ্জনের দিকে। বললেন, তোমরা ভালো থাকলেই, আমরা ভালো থাকি বাবা! সব মায়েরাই যেমন বলে থাকেন আর কি!
 হুইলচেয়ারে মা এগোলেন। এবার ফেরা বাড়ির দিকে! পেছন পেছন আমি। লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার আগে পর্যন্ত অঞ্জন দাঁড়িয়েছিল ওর চিরায়ত ভঙ্গিতে। মুখে স্মিত হাসি! যা একমাত্র ওকেই মানায়!

-এখন কেমন আছিস!

-ভালো। জ্বরটাও নেই! এ যাত্রায় সামলে নিলাম বুঝলি।

-তাড়াতাড়ি সেরে ওঠ । তোর শুয়ে থাকলে চলে। 
ও হাসল! ফোনের আড়ালে হলেও, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম ওর মুখ!

– ধ্যুস! আমি ঠিক আছি। সবাই শুধু বেশি-বেশি চিন্তা করছে। তুই ঠিক আছিস তো! 

আমি বললাম,ভোটটা মিটুক। তারপর তোর সঙ্গে একটা জমাট আড্ডা হবে।

– থ্যাংক ইউ রে!
 
-কেন? 

– তুই ফোন করলি!

– শোন! এই মুহূর্তে তোকে গালাগালি করতে চাই না। ভালো হয়ে যা। তারপর তোর সঙ্গে বোঝাপড়া আছে।
 
অঞ্জন হাসল! আমার জন্য সেই শেষবার!

এরপর পশ্চিমবঙ্গের হাইভোল্টেজ ভোট। আমি এখন সরাসরি কোনও সংবাদ প্রতিষ্ঠানে যুক্ত নই। মেধাশ্রমিক হিসেবে ঠিকাদারি করি। ওই কনসালটেন্সি আর কি! ভোটের বাজারে দিল্লির বন্ধুদের বদান্যতায় আমারও কিছু কাজ ছুটে গিয়েছিল। যেতেও হচ্ছিল কিছু জেলায়। মাঝে খবর পেয়েছিলাম, অঞ্জন হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে। খটকা লাগল ভোট গণনার দিন! যে যার মতো চ্যানেলে-চ্যানেলে গলা ফাটাচ্ছে। আমিও জুটে গিয়েছিলাম আমার আদি প্রতিষ্ঠানে, আদি পেশায় । আকাশবাণী দিল্লির জাতীয় সংবাদসেবায় সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত হিন্দি ও ইংরেজি বুলেটিনে ভোট গণনার খবরাখবর, তার গতি প্রকৃতি, চড়াই উতরাই নিয়ে স্ক্রিপ্ট, ভয়েস কাস্ট, লাইভ করে গেছি। দিনভর রিমোট নিয়ে চ্যানেল সার্চ করেছি। কিন্তু  অঞ্জনকে দেখতে পেলাম না! এমন একটা দিনে অঞ্জন স্ক্রিনে নেই, ভাবাই যায় না! কিন্তু ঘটনা হল ২ মে পুরো দিনই অঞ্জন ২৪ ঘণ্টার স্ক্রিন থেকে উধাও! কী হল আবার!

 

১০ মে, আবার একটা ফোন পেলাম। 
-শুনেছো, অঞ্জনদা আবার হাসপাতালে। সিরিয়াস অবস্থা!
 
-সেকি! আবারও ফোন জুঁই, মৌপিয়াকে। 

খবরটা সত্যি! প্রবল শ্বাসকষ্ট। অঞ্জনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। ভেন্টিলেশনে। মাঝরাত্তিরে জুঁইয়ের কাছ থেকে খবর পেলাম মেডিকেল বোর্ড ওঁর দেখভাল করছে। রাত সাড়ে দশটায় ভেন্টিলেশন, ইসিএমও শুরু হয়েছে। সঙ্গে সিডেটিভ। ১১ তারিখ সকালে জুঁই জানাল, অঞ্জনের শ্বাসকষ্ট অনেকটা কমেছে। অক্সিজেন স্যাচুরেশন অনেকটা ভালো। ব্লাড প্রেসার-সহ অন্যান্য শারীরিক অবস্থাও প্রায় স্বাভাবিক। কিছুটা নিশ্চিন্ত হলাম।

এরপর নিত্যদিন খবরা-খবর নেওয়া চলছিল নানা জনের কাছ থেকে। অবশেষে চূড়ান্ত ফোনটা এল অমৃতার (অমৃতা ভট্টাচার্য, প্রাক্তন সহকর্মী) কাছ থেকেই।  ১৬ তারিখ রাত দশটা। 

-নীলদা! মনে হচ্ছে অঞ্জনদা আর নেই! 
কান্নায় বসে যাওয়া একটা গলা!

– মানে? কখন? কীভাবে? তোকে কে বলল?
-দেবযানী (দেবযানী চৌবে, প্রাক্তন সহকর্মী)! ও খুব কাঁদছিল!

– সে কী! দাঁড়া, খোঁজ নিই! আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না!

জুঁইয়ের ফোন ব্যস্ত পেলাম। সেটাই স্বাভাবিক! ফোনের ওপার থেকে মৌপিয়ার বাঁধভাঙা কান্না জানান দিল, খবরটা নির্মমভাবে সত্যি! মৌপিয়া তো কাঁদবেই! ওর সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে শুধুমাত্র অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। একাধারে ও অঞ্জনের মানসকন্যাও! অঞ্জন তিলে তিলে নির্মাণ করেছে ওকে। অঞ্জন ওর জীবনে ধ্রুবতারা! আমি ওকে কাঁদতে দিলাম!

আমার অস্তিত্ত্বও কে যেন ভিত থেকে নড়িয়ে দিল! সংগীতা লক্ষ্য করছিল আমার অস্থিরতা। আমি কথা বলার অবস্থায় ছিলাম না। শুধু বললাম, অঞ্জন আর নেই। আমার ফোনটা বাড়িয়ে দিলাম, বললাম, গুরুত্বপূর্ণ ফোন ছাড়া আমায় দিও না। অঞ্জন ও আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষকে খবরটা জানাতে বলে, আমি ঢুকে পড়লাম নিভৃতবাসে। সম্পূর্ণ ফাঁকা এক অসীম শূন্যতার মধ্যে। 
রাতে জুঁইয়ের ফোন এল। ওর গলাতেও বোবা যন্ত্রণা। বলল, মালিক- মালিক! মালিক তো চলে গেল! মালিক আর নেই! আমি নিজেই তখন ভাষা হারিয়েছি। কী ভাবে সান্ত্বনা দেব ওঁকে! ও বলল, কিছুই করা গেল না। ডাক্তাররা প্রাণপাত করেছেন। রেয়ারেস্ট অফ দ্য রেয়ার কেস! শুনলাম! শুধু বলতে পারলাম, সাবধানে থাকিস জুঁই। তিতলিকেও সাবধানে রাখিস!  দুলে উঠল আমার পৃথিবীও! কোথাও কি বান ডাকছে! কোথাও কি পাড় ভাঙছে!

১৭ তারিখ বিকেলে প্রাক্তন সহকর্মীদের ফোন পেলাম। ওরা ওদের এখনকার চ্যানেলে ‘আমাদের অঞ্জনদা’ নামে একটা অনুষ্ঠান করছে। আমাকে চাই। অঞ্জনের নামে ডাক। না করতে পারলাম না। দেখা হল বেশ কয়েকজন প্রাক্তন সহকর্মীর সঙ্গে। ওঁদের আন্তরিক স্মৃতিচারণ শুনলাম। আমিও বললাম মিনিট দুয়েক। কিন্তু বলতে পারলাম কই! কত কথা যে বাকি রয়ে গেল!

 ২৫ বছরের একটা সম্পর্ককে কি কোনও সময়ের ঘেরাটোপে বেঁধে ফেলা যায়?

অঞ্জনের সঙ্গে মুখোমুখি আলাপের আগেই আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ওর নামের সঙ্গে আমার পরিচিতি। পরিচয়ের সূত্রপাত আনন্দবাজারের নতুন দিল্লির অফিসে। আমি তখন দিল্লিতে আকাশবাণীতে কর্মরত। রফি মার্গের আইএনএস বিল্ডিংয়ে আনন্দবাজারের ব্যুরো। সুমনদা (সুমন চট্টোপাধ্যায়) তখন কলকাতা ফিরে এসেছেন আনন্দবাজারের অন্যতম কর্ণধার হয়ে। দিল্লি দপ্তরে সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় তখন ব্যুরো চিফ। তাঁর সঙ্গী এক ঝাঁক তরুণ তুর্কি! বিশ্বজিৎ রায় (মধু), অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, অনিন্দ্য জানা, আরো দু-একজন। এর মধ্যে, বিশ্বজিৎ আমার পূর্ব-পরিচিত, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সৌজন্যে। সৌম্যদা’র সঙ্গে আলাপ দিল্লির সাংস্কৃতিক-জীবনে আমার উৎপাতের দরুন। সেই সময়, শিশিরদা’র ( ডঃ শিশির দাস) একটা নাটক ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-য়ে আমাকে নামভূমিকায় অর্থাৎ ‘পাষাণে’র চরিত্রে অভিনয় করতে হয়েছিল। সেই অভিনয়ের সুনাম অথবা দুর্নামের কারণেই হোক, অনেকের সঙ্গেই আলাপ হয়েছিল। তার মধ্যে সৌম্যদা, জয়ন্ত ঘোষাল (তখন বর্তমান পত্রিকার দিল্লি ব্যুরো চিফ), দেবারুণ রায় (আজকাল পত্রিকার  দিল্লি ব্যুরো চিফ) অগ্রগণ্য। সৌম্যদা-তো আমাকে ‘পাষাণ’ নামেই ডাকা শুরু করে দিয়েছিলেন। একবার বলেছিলেন, তোর অফিস তো সংসদ মার্গে। হাঁটা  দূরত্ব। চলে আসিস সন্ধ্যের দিকে, আড্ডা মারা যাবে! সরকারি পেশাদারি কাজের হ্যাপা সামলেও আমার হাতে তখন অঢেল সময়। অগত্যা অহরহ ‘বর্তমান’, ‘আজকাল’, ‘গণশক্তি’র অফিসে গেছি। ‘বর্তমানে’ তখন জয়ন্তদা ও অতনুর (অতনু ভট্টাচার্য) জমাট সংসার। অতনুর সঙ্গেই বেশি আড্ডা হত। মাঝেমধ্যে জয়ন্তদাকে পেতাম। দেখতাম পাতার পর পাতা লিখে চলেছেন এক অসামান্য দক্ষতায়, একের-পর-এক বিষয় নিয়ে প্রায় সব্যসাচীর মতো! ‘আজকালে’র দেবারুণদা ছিলেন অমায়িক। আমাকে স্নেহ করতেন!
২১ অশোক রোডে সোমনাথ চ্যাটার্জির বাংলোয় ছিল ‘গণশক্তি’র আস্তানা। সেখানে অরূপদা- অরিজিৎ-দেবাশিস-মিঠুন-তাপস-সালাম এক একান্নবর্তী পরিবারের মতো। কাগজ বিছিয়ে মুড়ি-বাদাম-সিঙাড়া সহযোগে এই সান্ধ্য আড্ডা ছিল বেশ জমজমাট। এমনই এক সময়ে, আনন্দবাজারের দপ্তরে পা রেখেছিলাম। অনিন্দ্য ছিল দারুন মিশুকে, আড্ডাবাজ। বেশ ভালো গাইত। খোলা গলায় ওর রবীন্দ্রসংগীত, অনেক বাঘা বাঘা গাইয়েকেও যে কোনো সময়ে লজ্জায় ফেলে দেবে! নিশীথ রাতে, খোলা আকাশের নীচে ওর গাওয়া একের-পর -এক গান দিল্লির প্রাতিষ্ঠানিক গাম্ভীর্যকে খান-খান করে দিত! ইন্ডিয়া গেট আজও তার সাক্ষী হয়ে আছে! মধু স্বভাবে তার্কিক,তাত্ত্বিক, ভাবগম্ভীর অঞ্জন একরাশ তাজা হাওয়া! উজ্জ্বল, উচ্ছল। যে কোনো আড্ডার শালগ্রাম শিলা! আলাপ হয়ে গেল, ভালো লেগে গেল সেই শুরু! এভাবেই চলছিল।

১৯৯৯-এ জি থেকে ডাক পেলাম! জি কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার চ্যানেল চালু করার। সেইমতো শুরু হল প্রস্তুতি। একে একে আত্মপ্রকাশ করল আলফা বাংলা, আলফা মারাঠি, আলফা গুজরাতি, আলফা পাঞ্জাবি। জি-নিউজে তখন রাজু সন্থানাম, শৈলেশ কুমার, অলোক ভার্মা, রাকেশ খার, শাজী জামান, বিনোদ কাপড়ি– নক্ষত্রের ছড়াছড়ি। 

‘আলফা বাংলা’ টিমে ঈশানী দত্ত প্রডিউসার । আমি ডেস্ক ও কনটেন্টের দায়িত্বে । দেবযানী রায়, পুলক মিত্র, জুন এল। এল জুঁই (অদিতি বন্দোপাধ্যায়)। কলকাতায় তখন জি- নিউজের ছোট্ট একটা ব্যুরো। দায়িত্বে জে সাগর।  রিপোর্টিংয়ে রিকা রয়, নন্দিনী গুহ, মাসুম দত্ত, সোনালি, চয়ন কুন্ডু, শিবাজী দত্ত। ক্যামেরায় দেবাশিস বটব্যাল। এবং আদি ও অকৃত্রিম লেস্টার বরিলহন! বেশ চলছিল! প্রথমে দিনে ১টা, পরে ২টি ৩০ মিনিটের বুলেটিন। আমার যেহেতু স্ক্রিপ্ট, ভয়েস কাস্ট, প্রোডাকশন নিয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল, তাই নতুন টেলিভিশনের কাজে নিজেকে মানানসই করে তুলতে খুব একটা সময় লাগেনি। যেটুকু বাকি ছিল, সেটাও ভরাট হয়ে গেল স্বর্ণেন্দু চাকী ও চন্দন প্রতাপ সিংয়ের আন্তরিক উদ্যোগে। কাজের চাপ মেরে-কেটে কয়েক ঘণ্টা। তবু এরই মধ্যে সবার সঙ্গে এক অন্যরকম পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠল।

সেসময় অফিসের কাজ সেরে অঞ্জন আসত জুঁইকে নিতে। বসত আমাদের কাজের ক্ষেত্র লাগোয়া রিসেপশনে। প্রায়শই আমি ওকে উদ্ধার করতাম। তখন এক সন্ধিক্ষণের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলা সংবাদমাধ্যম। ধীরে ধীরে মাথা তুলছে একের-পর-এক বাংলা টিভি চ্যানেল। দূরদর্শনের সরকারি ঘেরাটোপের বাইরে একটা স্বাধীন অস্তিত্ব। জীবনের অনেকটা কাছাকাছি। সে সময় সংবাদপত্রে কাজ করা বহু সাংবাদিকই পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে দোটানায় ছিলেন। অঞ্জনও তার ব্যতিক্রম ছিল না। ও আমার কাছে বুঝতে বুঝতে চাইত, টেলিভিশনের খুঁটিনাটি। আমি ওকে ঘুরে ঘুরে দেখাতাম কর্মপদ্ধতি, এডিট সেট-আপ, স্টুডিও। সেটা তখন ভিএইচএস, বিটা, অ্যানালগের যুগ। দিন-দিন এই পেশা নিয়ে ওর আগ্রহ বাড়ছিল। চাপ বাড়ছিল আমাদেরও। 

তখন যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন আজকের মতো এত সহজলভ্য ছিল না। তারই মধ্যে ‘ই-টিভি বাংলা’ লঞ্চ হয়েছে। আসার অপেক্ষায় ‘তারা’। ‘আকাশ বাংলা’ প্রস্তুত। ‘খবর এখন’ দিন-দিন পরিচিত হয়ে উঠছে। এর কিছুদিন পরেই দূরদর্শনে আলো ছড়াবে ‘খাস খবর’।  ফলে, দিনান্তে সাজিয়ে-গুছিয়ে একটা সংবাদ বুলেটিন তৈরি করা, আর তাকে একই সঙ্গে সময়োপযোগী রাখা রীতিমতো মুশকিল হয়ে পড়ছিল। অগত্যা সিদ্ধান্ত নয়ডা থেকে নয়। এবার লড়াই শুরু হোক প্রত্যেক রাজ্যের সদর থেকে। সেই মতো বাংলা কলকাতায়, মারাঠি মুম্বইয়ে, আর গুজরাতি আমেদাবাদ থেকে নতুন করে চালু করার সিদ্ধান্ত হল। পাঞ্জাবি শুধু রয়ে গেল নয়ডাতেই । আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হল কলকাতা বা মুম্বই যে কোনো একটি ক্ষেত্র নির্বাচন করার। শেকড়ের টানে আমি ফিরে এলাম কলকাতায়। 

২০০০ সালের ১৫ অগস্ট, ৫ লেক অ্যাভিনিউ, মুদিয়ালি থেকে শুরু হল আলফা বাংলা খবরের নবকলেবর যাত্রা। জে সাগর তখন নেই। মাসুম, সোনালিও ছেড়ে দিয়েছে। আছে নন্দিনী, চয়ন, রিকা, শিবাজি ও দেবাশিস। আমার সঙ্গে এল দেবযানী ও পুলক। অফিস ভাঙা-গড়া শুরু হল। গ্যারেজে হল ক্যামেরা ও স্টোর রুম। একতলায় সামনের ঘরে রিসেপশন, রিপোর্টারদের বসার জায়গা। ভেতরের একটা ঘরে ডেস্ক, এডিটিং। অন্য একটা ঘরকে কেটে  ভিস্যাট, মেকআপ, গ্রাফিক্স। অন্য দুটো ঘরে পিসিআর আর স্টুডিও। সাকুল্যে এই! নিয়োগ শুরু হল। বড় হওয়ার স্বপ্ন চোখে নিয়ে আলফা টিমে যোগ দিলেন সুমন দে, অর্কপ্রভ সরকার, অয়ন ঘোষাল, বিপাশা মুখার্জি, মন্দিরা, অমৃতা, উষসী, পারমিতা-সহ এমন আরো অনেকে। শুরু হল সময়ের সঙ্গে এক অসম যুদ্ধ। ওই দপ্তর থেকেই ‘আলফা বাংলা’র যাবতীয় নন-ফিকশন অনুষ্ঠান এবং জি নিউজ ব্যুরোর কাজ চলত। দুটোরই দায়িত্বে আমি।

আমি দিল্লি ছেড়ে চলে আসার কিছুদিন পরেই খবর পাই, অঞ্জন ‘আনন্দবাজারে’র কাজ ছেড়ে হায়দরাবাদে ‘ইটিভি বাংলা’য় যোগ দিয়েছে। ‘ইটিভি বাংলা’র অন্যতম কর্ণধার ‘মামা’ সিদ্ধার্থ সরকার। ‘মামা’র সঙ্গে সেই সময় মাঝেমধ্যে নানা বিষয়ে কথা হত। উঠত অঞ্জন-প্রসঙ্গও।

সময়ের সঙ্গে বাস্তবতারও বদল ঘটছিল দ্রুত। ইতিমধ্যে জি-পরিবার আরও বড় হয়েছে। আত্মপ্রকাশ ঘটেছে ‘জি-বাংলা’র! লেক অ্যাভিনিউ’র অফিস থেকে তখন একযোগে ‘জি-নিউজ’, ‘জি-বিজনেস’, ‘জি-স্পোর্টস’ ও ‘জি-বাংলা’ নিউজের কাজকর্ম পরিচালিত হত। তবু একটা নিজস্ব সংবাদ চ্যানেলের প্রয়োজন আমরা অনুভব করছিলাম সবাই। অঞ্জনও ততদিনে কলকাতা ফিরে এসেছে । থিতু হয়েছে ‘আকাশ বাংলা’য়, বছর খানেক আগে। সল্টলেক সেক্টর ফাইভে এইচডিএফ বিল্ডিং থেকেই  চলত ওদের কর্মকাণ্ড।

২০০৫-এর মাঝামাঝি জি-কর্তৃপক্ষ একটা নিজস্ব বাংলা সংবাদ চ্যানেল লঞ্চ করার সিদ্ধান্ত নিল। সেই মতো একটা আলগা প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গেল। অগাস্টের শেষাশেষি আমাকে মৌখিক ভাবে জানিয়ে দেওয়া হল ‘জি-নিউজ’ কার্যক্রমের প্রথম আঞ্চলিক সংবাদ চ্যানেল ‘জি-নিউজ বাংলা’র দায়িত্ব নিতে আমি যেন প্রস্তুত হই। সেপ্টেম্বরে চিঠিও পেলাম হাতে। ইতিমধ্যে রাজনৈতিক স্তরেও এক সমান্তরাল উদ্যোগ শুরু হয়ে গিয়েছিল। যা আমি জানতে পারি আরো কিছুদিন পরে।  চিঠি হাতে পাওয়ার কিছুদিন পরে, হঠাৎই ফোন পেলাম অঞ্জনের!

– কী রে কেমন আছিস?

– এতদিন পর! তোর কী খবর? 
সামান্য কুশল বিনিময়ের পরে, ও বলল, তুই কি আজ সন্ধ্যায় ফ্রি আছিস? দেখা হতে পারে? আমার সেদিন তেমন কোনও ব্যস্ততা ছিল না। বললাম -হতে পারে। কখন? কোথায়? 

– বোলার্স ডেন-এ!

– সেটা কোথায়?
 
-আরে, নিকো পার্কের গেটের পাশে। চলে আয়, আটটায়।

– ঠিক আছে।

আমাদের আবার দেখা হল দীর্ঘ পাঁচ বছর পর। অঞ্জন যথারীতি অনায়াস, আন্তরিক। আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম। শুরু হল আমাদের কথাবার্তা। উঠে এল যৌথ অংশীদারির প্রসঙ্গ ও কিছু বাস্তবতা! যার দুই প্রান্তে সেনাপতির ভূমিকায় আমরা দুই অভিন্নহৃদয় বন্ধু। ঘটনার আকস্মিকতা ছিল! তবু, এতদিন পর কাছ থেকে ওকে দেখে, কথা বলে বেশ ভালো লাগছিল। বললাম, দু-একদিন ভেবে নিই, তারপর জানাচ্ছি! পরের দিন দুটো ফোন পেলাম। প্রথমটা অভীক দা’র (অভীক দত্ত। অনেকে বলতো অঞ্জন ওঁর মানসপুত্র! তা নিন্দুকেরা বলতেই পারেন! আমি দেখেছি, অঞ্জনের প্রতি অসম্ভব স্নেহপ্রবণ ছিলেন তিনি। ভালবাসতেন প্রচণ্ড। বুকে আগলে রক্ষা করতেন। প্রশ্রয়ও দিতেন অবিরাম)!

পরের ফোন অঞ্জনের। অঞ্জন এমনই! যেটা মাথায় ঢুকবে সেটা হাসিল না হওয়া পর্যন্ত, অন্যের মাথার পোকা নাড়িয়ে যাবে। এটাই ওর একবগ্গা রোখ! এটাই ওর স্বভাব! ওর প্রশ্নে আমি হাসলাম! বললাম, দাঁড়া, কথা বলছি দিল্লির সঙ্গে!

পরদিনই কথা হল দিল্লির সঙ্গে। এটা ঠিক, যৌথ অংশীদারির একটা রূপরেখা তৈরি হয়েছে। কিন্তু চ্যানেলের দায়িত্ব বা পরিচালনায় কান্ডারির ভূমিকা নিশ্চিত। আমার কথা শুনে, এইচআর আর আমার ‘মেন্টর’ ও ‘বস’ একইসঙ্গে বিস্মিত, হতবাক! তারা বলল, এটা কী করে সম্ভব! আমি যুক্তি সাজালাম, আমার মতো করে। ওরা তাও বলল, আবার যেন আমি ভালোভাবে ভেবে দেখি, যাতে ভবিষ্যতে কোনও বিড়ম্বনায় যেন আমাকে পড়তে না হয় (সেটা হয়তো তারা ঠিকই ভেবেছিলেন। আমি তার রূঢ় বাস্তবতা অনুভব করতে পারি ২০১৪ শেষ পর্বে। ১৬ বছর কাজ করার পর ‘জি- নিউজ’ পরিবার থেকে বিদায় নেওয়ার পূর্বলগ্নে।)! আমি অনড় ! আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলাম! এটা সম্ভব হয়েছিল অঞ্জনের জন্যই। অঞ্জন ছাড়া অন্য কারোর জন্যই আমার এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না!

এরপরই দ্রুত বল গড়াতে শুরু করল। ডিসেম্বরে পোদ্দার কোর্টে ফ্লোর নেওয়া হল। ১নং গেটের  পাঁচ তলায়, ১৬ হাজার স্ক্যোয়ার ফুট জায়গা । ততদিনে জন্ম নিয়েছে নতুন কোম্পানি ‘জি আকাশ নিউজ প্রাইভেট লিমিটেড’, যাতে জি-র শেয়ার ৬০%, আকাশের ৪০%। গঠিত হয়েছে কোর টিম। যার সদস্য আমি ও অঞ্জন। সঙ্গে ‘আকাশ’ থেকে আসা কৌশিক সেন, রাহুল পুরকায়স্থ। মার্কেটিংয়ে অসীম মুখার্জি। সেলসে অমিতাভ ঘোষ, রাজেশ নায়ার। ফিন্যান্সে অরুণ আগরওয়াল। দিল্লি থেকে এলেন ওয়াই পি সিং এবং জ্যোতিরিন্দ্র ঘোষ। মাথার উপর দুই ডিরেক্টর– ‘জি’ থেকে লক্ষ্মীনারায়ণ গোয়েল, ‘আকাশ’ থেকে অভীক দত্ত। দুজনেরই অগাধ আস্থা ছিল আমাদের উপর।

শুরু হল অফিস গড়ার কাজ । যার মূল রূপকার জ্যোতিরিন্দ্র ঘোষ। ওয়াই পি’জি এবং আমি তাঁকে কিছুটা সংগত করেছিলাম। আর প্রযুক্তি ও কারিগরি দিক থেকে কোনও আপস করব না, এটা আমরা ম্যানেজমেন্টকে আগেই জানিয়ে দিয়েছিলাম! 
জানুয়ারি থেকে শুরু হল লোক নেওয়ার কাজ। এল এক ঝাঁক তরুণ তুর্কি– সাম্য, কৃশানু, দীপেন্দ্র, উপল, অদিতি। প্রোমো  তৈরিতে সাহায্য করতে এগিয়ে এল অয়ন- অসিত- ভাস্কর। গ্রাফিক্সের কাজে দেবাশিস। ‘জি- নিউজ কলকাতা ব্যুরো’র প্রযুক্তি ও কারিগরি বিভাগের কর্মীরা ২৪ ঘণ্টার  বিভিন্ন টেকনিক্যাল স্টেশনের দায়িত্ব বুঝে নিল। পরীক্ষা ইন্টারভিউ উতরে টিম ২৪-য়ে যোগ দিল অয়ন ভট্টাচার্য, সুদেষ্ণা, শ্রাবণী, অঞ্জন রায়, সপ্তর্ষি সোম, সৌরভ গুহ, সোমশুভ্র মুখার্জি,  অমৃতাংশু ভট্টাচার্য, সুচিক্কন দাস– এমন আরও অনেকে। এল পেশায় নতুন আসা একঝাঁক তরুণ-তরুণীও। একদিকে যখন অফিস গড়ার কাজ  চলছে, তখন অন্য দিকে শুরু হল ২৪-এর প্রস্তুতিপর্ব। ওয়ার্কশপ!

সুদীপ্ত সেনগুপ্ত এল আমাদের সঙ্গে। ওর বলিষ্ঠ, ঋজু দৃষ্টিভঙ্গি ২৪ ঘণ্টাকে অনেক ক্ষেত্রেই সাহায্য করেছে। শর্মিষ্ঠা (শর্মিষ্ঠা গোস্বামী) সকালের অনুষ্ঠান ও বিনোদন বিভাগের দায়িত্ব নিল, রাহুলদার তত্ত্বাবধানে। মৌপিয়া এসেছে তারও অনেক পরে, কিছু একটা করে দেখানোর অদম্য স্পর্ধা নিয়ে!

প্রাথমিক পর্বে ধোঁয়াশা ছিল চ্যানেলের নাম নিয়ে। ‘জি-নিউজ বাংলা’ হবে না, ‘২৪ ঘণ্টা’! শিলমোহর পড়ল ‘২৪ ঘণ্টা’র মাথাতেই। ঠিক হল ৩১ মার্চ, ২০০৬ লঞ্চ হবে চ্যানেল। সেইমতো ড্রাই-রান শুরু হয়েছিল ২২-২৩ নাগাদ! ২৬ একটা অঘটন ঘটল। অনিল বিশ্বাসের অকাল মৃত্যু! তারই লাইভ কভারেজ দিয়ে বাংলা সংবাদ জগতে পথ চলা শুরু হল ২৪ ঘণ্টার। আগেই অঞ্জন ও আমি, আমাদের কাজের দায়িত্ব নিজেরাই ভাগ করে বুঝে নিয়েছিলাম। যার যা ভালো, তাকে অগ্রাধিকার দিয়েই আমরা শুরু করেছিলাম আমাদের নতুন যাত্রা। রিপোর্টিং, লাইব্রেরি ও রেফারেন্স থেকে সব ‘ইনপুট’ অর্থাৎ  খবরের বাজার হাটের দায়িত্ব নিয়েছিল অঞ্জন, ‘এডিটর ইনপুট’ হিসেবে। আর আমি ছিলাম রান্নাবান্না, উপস্থাপনা, কারিগরি, ট্রানমিশন ও আনুষঙ্গিক অপারেশন অর্থাৎ ‘এডিটর আউটপুটে’র দায়িত্বে। সেই সঙ্গে ‘জি-নিউজ’ সংক্রান্ত অন্যান্য বাড়তি দায়িত্ব তো ছিলই। যুগলবন্দির সেই শুরু।

যার বিস্তৃতি টানা আট বছর ৯ মাস! বছরের পর বছর আমাদের গ্রেড বদলেছে, বেতনক্রম পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু ডেজিগনেশন ওই একই! নানা তালে রঙ্গ-বিভঙ্গেও সেই বোঝাপড়ায় ছেদ পড়েনি। বন্ধন ছিল অটুট! আমরা খেলতাম এমন একটা মাঠে, যেখানে অঞ্জন ছিল স্ট্রাইকার, আর আমি ছিলাম গোলকিপার! অঞ্জন লিড করত সামনে থেকে, সরাসরি ফ্রন্টলাইনে। আমি পেছনে দাঁড়িয়ে টিমকে পরিচালনা করতাম এমন ভাবে, যেন ও স্বচ্ছন্দে নিজের খেলাটা চালিয়ে যেতে পারে!  তার ফলও ফলতে শুরু করেছিল অচিরেই! ৬মাসের মধ্যেই এক নম্বর হওয়ার মধ্যে দিয়ে যার সূচনা, বছরের পর বছর ১ নম্বর থাকা তারই উজ্জ্বল স্বাক্ষর! সবাই জানতে চাইত, আসলে সাফল্যের রহস্যটা কী?

‘২৪ ঘণ্টা’ বাংলা খবরের জগতে গতির ঝড় এনেছিল। একঘেয়েমি দূর করেছিল। স্টুডিওর খবরাখবর নয়, সরাসরি ঘটনাস্থল থেকে খবর প্রচার করে চ্যানেলকে পৌঁছে দিয়েছিল সাধারণ মানুষের ঘরের দোরগোড়ায়। সেইসঙ্গে মনকাড়া সব প্রোগ্রামিং, যা সম্পূর্ণ এক অন্যরকম নতুনত্বের স্বাদ এনে দিয়েছিল বাঙালি দর্শকসমাজে। 

‘২৪ ঘণ্টা’র সম্পদ ছিল ‘টিম ২৪ ঘণ্টা’। এক অসম্ভব সৃজনশীল, প্রতিভাবান, হার-না-মানা ইস্পাতকঠিন লড়াকু মানসিকতা সম্পন্ন দলের নেতৃত্ব দেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমাদের। যেখানে পরস্পরের মধ্যে পরস্পরকে টেক্কা দেওয়ার একটা সূক্ষ্ম স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতাও থাকত। আর সেই সঙ্গে থাকত সবসময়ই নতুন কিছু করে দেখানোর তাগিদ। রাহুলদা ও কৌশিক,কত নতুন অনুষ্ঠানের জন্ম দিয়েছে। চ্যানেলের জন্মলগ্ন থেকেই ‘ঝাঁকের কৈ’ আমরা হইনি। চেষ্টা করেছি সব সময় আমাদের কাজের মধ্যে নতুন কোনও মাত্রা দিতে। এটাই ছিল আমাদের একমাত্র চ্যালেঞ্জ! ধরা যাক, চ্যানেল মন্তাজের কথা! কোর টিমের মিটিংয়ে আমি বললাম, ওই গ্লোব ঘোরা, গ্রাফিক্যাল জার্নি আর সঙ্গে ঢ্যাং ঢ্যাং মিউজিক- একেবারেই ক্লিশে — অন্য কিছু করা যায় না? সবাই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। হঠাত্‍ই আমার মাথায় একটা আইডিয়া এল। বললাম, সংবাদমাধ্যমের সব চেয়ে হ্যাপেনিং প্লেস হচ্ছে তার নিউজরুম। সবসময় ব্যস্ততা। এটা নিয়ে কাজ করা যায় না! অঞ্জন লাফিয়ে উঠল, বলল, এটা দারুণ আইডিয়া! কিন্তু কী ভাবে করা যায়?  কৌশিক বলল, এটা ক্রোমায় শুট করে করা সম্ভব! কিন্তু করবে কে? রাহুলদা বলল, মুম্বইয়ের স্বনামধন্য চিত্রগ্রাহক অভীক মুখোপাধ্যায়ের কথা! আমরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললাম। অভীক এল। শুট করল। এরপর মিউজিক! সিগনেচার টিউন, চ্যানেল মিউজিক কে বানাবে? প্রাথমিক আলোচনায় ঠিক হল পণ্ডিত বিক্রম ঘোষকে অনুরোধ করা যেতে পারে! কৌশিককে দায়িত্ব দেওয়া হল! এভাবেই কখনও কৌশিক, কখনও রাহুলদা, কখনও-বা অন্য কারো সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করে গেছি আমি! 

অঞ্জন ও আমি কাজের পর্যালোচনা করেছি! আবার পরিমার্জন, সংশোধন হয়েছে। এভাবেই রূপ পেয়েছে, প্রকাশিত হয়েছে নানা সৃষ্টি! তা সে রোজকার ‘আপনার রায়’, ‘পেজ ওয়ান’ হোক বা ‘আমার দুর্গা ঠাকুর’, ‘পাড়ায় পাড়ায় পুজো লড়াই’, অনিলাভ’র ‘এক্সট্রা টাইম’, ‘কলকাতা ফুটবল লিগ’, ‘স্টেট সামিট’, ‘নিউজ মেকার’, ‘সংকল্প’, ‘বাংলার গৌরব’, ‘আমার শহর’ অথবা ‘অনন্য সম্মান’ই হোক! এক্ষেত্রে, অভীকদার সাহচর্য সবসময়ই আমাদের বাড়তি ইন্ধন ও প্রেরণা জুগিয়েছে। বরুণ দাসের ‘জি-নিউজ’ নেটওয়ার্কের সিইও হয়ে আসা ‘২৪ ঘণ্টা’র ক্ষেত্রে স্বপ্নের উড়ানের পথ খুলে দিয়েছিল! মূলত ওরই উদ্যোগে এক ক্যালেন্ডার বর্ষে আমরা ৬টি ছোট-বড় ইভেন্টের জন্ম দিয়েছিলাম। 

‘অনন্য সম্মান’ তারই অন্যতম উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা! বরুণ বলল, একটা অ্যাওয়ার্ড ফাংশন করতে হবে। তখন অ্যাওয়ার্ড ফাংশন মানেই, সমাজের কীর্তিমান, বহুল প্রশংসিত মানুষদের নিয়ে এসে পুরস্কৃত করার বাঁধা গত। আমরা এই ধারাটা বদলাতে চাইলাম। আমরা আনলাম অনন্যসাধারণকে সম্মানিত করার ধারা! মনে রাখতে হবে, আমরা এমন সময়ে, এইসব নীরবে কাজ করে চলা মানুষদের সম্মানিত করতে শুরু করেছি, যখন সিএসআর-এর ধারণাই প্রকাশ্যে আসেনি। 

টিম ২৪–এর যে কোনো সৃষ্টির পেছনেই থাকত তার প্রতিটি সদস্যের কন্ট্রিবিউশন! আমরা সবাই মেধা,সৃজনশীল ভাবনা ও পরিশ্রম দিয়ে তাকে পুষ্ট করেছি। সাফল্যের কৃতিত্ব টিমের সবার মধ্যে ভাগ করে দিয়েছি। ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিয়েছি আমরা– শুধু আমি ও অঞ্জন! সবার সঙ্গে থেকে সবার অংশীদারিত্বে সেরা কাজের নিদর্শন তুলে ধরাটাই আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল। সে ক্ষেত্রে সবার সাহায্য পেয়েছি আঠারো আনা। এর ব্যতিক্রম হয়েছে কখনো-সখনো কাজ করলে ভুল হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একই ভুল দ্বিতীয়বার করাটা অমার্জনীয় অপরাধ। এ বিষয়ে অঞ্জন ছিল অত্যন্ত কঠোর। আমিও তাই! প্রশংসা বা তিরস্কারে আমরা সবসময়ই উচ্চকিত থেকেছি। তবে অঞ্জনের তিরস্কারের ভাষা বলিষ্ঠ হলেও ব্যাকরণসম্মত! আর আমার মুখে যখন লাভা ছুটত, তখন তার অপ্রাকৃত শব্দের (অনেকটা ক্যাপটেন হ্যাডকের মতো) ধাক্কায় চারিদিকেই ত্রাহি-ত্রাহি অবস্থা হত! আমাদের অবশ্য দুজনেরই একটা ‘সুইচ অন’, ‘সুইচ অফ’ মোড থাকত। অঞ্জন যখন ভিসুভিয়াস, আমি সামলাতাম ওকে। আর ও আমাকে কতবার যে নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক থেকে বাঁচিয়েছে! এমনি নির্ভরতা ছিল আমাদের একের অন্যের প্রতি। আর টিমকে তাতানোর ক্ষেত্রে অঞ্জনের ভোকাল টনিক ও যার অবশ্যম্ভাবী সাফল্য প্রায় অরণ্যের প্রবাদের মতো হয়ে উঠেছিল। 

আমাদের মধ্যে অমিলের চেয়েও মিল ছিল বেশি। আমাদের দুজনের ক্ষেত্রেই হয়তো অনেক অযাচিত আঘাত এসেছে। আমাদের জুটি ভাঙার চেষ্টা হয়েছে। আমরা এ ধরনের যে কোনো প্রয়াসে উভয়ই উদাসীন থেকেছি। হয়তো আমাদের মধ্যে নানা বিষয়ে মতান্তর ছিল, কিন্তু তা কখনোই মনান্তরের কারণ হয়ে ওঠেনি! আমরা জানতাম, কোথাও না কোথাও আমাদের পরস্পরের প্রতি একটা হাত, একটা কাঁধ বাড়ানো আছে! এমনকি ‘২৪ ঘণ্টা’ ছেড়ে চলে আসার পর, এই সেদিন পর্যন্ত তা অটুট ছিল!
 

অনেকেই অঞ্জন ও আমার কাছে জানতে চাইত আমাদের এই যুগলবন্দির রসায়ন কী! আমাদের এই জুটিকে অনেকেই নানা নামে ডাকতেন। অধ্যাপক শিবাজীপ্রতিম বসু আমাদের ডাকতেন বাংলা সংবাদ চ্যানেলের ‘অমিতাভ বচ্চন- শাহরুখ খান’ জুটি বলে! অদিতি রায় আমাদের জুটিকে বিখ্যাত করেছিল ‘নীলাঞ্জন’ নাম দিয়ে। এমন আরো অনেক নাম ছিল আমাদের!  আসলে কী বলি বলুন তো!  আমাদের মধ্যে একটা অনায়াস সহজ সম্পর্ক ছিল, যার কেন্দ্রে ছিল পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা- বিশ্বাস-আস্থা-অপার নির্ভরশীলতা! আমরা একে অন্যের দিকে তাকালে বুকের অন্তঃস্থল পর্যন্ত দেখতে পেতাম। অঞ্জনের বুকে টুমুনির অনন্ত প্রবাহ। আমার বুকে আজও কাঁসাইয়ের বান ডাকে। আলাপনদা (আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়) ঠিকই বলেছেন, মফস্বলের ছেলেরা এমনই হয়! তাদের একটা নিজস্ব আকাশ থাকে। একটা নিজস্ব নদী থাকে। নিজস্ব পাহাড়-বনস্থলী!  আর একটা নিজস্ব দ্বীপ–একান্ত আপনজনদের জন্য, অথবা একা হতে-হতে নিজেই একটা আস্ত দ্বীপ হয়ে যাওয়া! শহরের মানুষেরা যার নাগালই পায় না! বেশ কয়েক দিন হল অঞ্জন চলে গেছে। যথারীতি নিজেই ব্রেকিং নিউজ হয়ে আলো ছড়িয়েছে নানা টিভি চ্যানেলে, খবরের কাগজের পাতায়-পাতায়! সবেতেই বড্ড তাড়া ছিল ওর!  তা বলে এভাবে চলে যেতে হয়!

এটা ঠিক, আমরা মফস্বলের ছেলেরা পেটে আগুন নিয়েই জন্মাই। তবু কতজনেরই-বা ক্ষমতা থাকে সেই আগুনের ফুলকি, অন্য সবার চোখে ছড়িয়ে দিয়ে তাদের কালপুরুষের মতো স্বপ্নসন্ধানী করে তুলতে! সবাই পারে না! অঞ্জন পেরেছিল! ‘২৪ঘণ্টা’ তারই জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে বেঁচে থাকবে, হয়তো, সময়ের অন্য প্রান্ত পর্যন্ত!  তাতে সেতুবন্ধনে কাঠবেড়ালির মতো আমার কিছু অকিঞ্চিৎকর ভূমিকা মুছে গেলেও ক্ষতি নেই! 

শুধু জানি, আমাকে ‘মালিক’ বলে ডাকবে না আর কেউ!  আমিও-বা কাকে ডাকব ‘মালিক’ বলে!

Out beyond ideas of wrongdoings and rightdoings, there is a field. I will meet you there. When the souls lies down in that grass, the world is too full to talk about!

আরও পড়ুন: অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় আমার স্মৃতিতে আছেন, আমার সত্তায় আছেন, আমার ভবিষ্যতেও থাকবেন



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

'কর্মীদের সুরক্ষা দিতে পারছি না', কেন্দ্রের দেওয়া নিরাপত্তা ছাড়লেন Locket

Sun May 23 , 2021
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাহিনীর প্রত্যাহারের আর্জি জানিয়ে চিঠি লিখেছেন তিনি। Source link

Breaking News

Recent Posts