নব্য বাংলা সাহিত্যের অদ্বিতীয় ‘অরণ্যপুরুষ’ বুদ্ধদেব। Buddhadeb Guha-author of Rivu series-a chartered accountant by profession-a forest lover and a romantic writer in approach

সৌমিত্র সেন

তিনি বনজ্যোৎস্নার তান্ত্রিক। তিনি বনফুলের পুরোহিত। তিনি ঝরা-বনপাতার বাউল। তাঁর সাহিত্যসাধনার সালোকসংশ্লেষে নীরবে এসে মিশেছে টাঁড়, বন, অরণ্যের নিবিড় আলোজলবাতাস। 

তিনি বুদ্ধদেব গুহ, ৮৫ বছর বয়সে এসে অরণ্যতলির কুটির থেকে পাকাপাকি তাঁর বাস তুললেন। রেখে গেলেন এমন এক ‘লেগাসি’, যা, বাংলা সাহিত্যে রাখা শুরু হয়েছিল প্রথমত বঙ্কিম-অগ্রজ সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং অনেক-অনেক পরে বিভূতিভূষণের বর্ণিল অরণ্যলেখার মাধ্যমে।

বুদ্ধদেব নিজেও চিরকাল বিভূতিভূষণ-মুগ্ধ;  ‘আরণ্যক’ তাঁর অন্যতম প্রিয় উপন্যাস; যদিও তিনি নিজেই ‘ক্লারিফাই’ করে দিয়েছেন বিভূতিভূষণের সঙ্গে তাঁর মন-মর্জির বিপুল ফারাকের কথা। মনে করিয়ে দিয়েছেন, বিভূতিভূষণ প্রকৃতিকে দেবীরূপে পুজো করেছেন, আর তিনি প্রকৃতিকে প্রেমিকারূপে রমণ করেছেন (বিভূতিভূষণ ছাড়াও তাঁর প্রিয় ঔপন্যাসিকের তালিকায় আছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও সতীনাথ ভাদুড়ী; ‘বিপ্রদাস’ ও ‘ঢোঁড়াই চরিতমানস’ তাঁর অন্যতম প্রিয় উপন্যাস)।

আরও পড়ুন: শুরু করেছিলেন শরৎচন্দ্র, ১৫০ বছর পরেও বলতে হচ্ছে, ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’

১৯৩৬ সালের ২৯ জুন জন্ম বুদ্ধদেবের।  ছোটবেলা কেটেছে বরিশাল ও রংপুরে। লেখক হবেন– এই ভাবে ভেবেই বড় হয়ে ওঠেননি অবশ্য অরণ্যতান্ত্রিক বুদ্ধদেব। কিন্তু যাঁর মামা সুনির্মল বসু, তাঁর তো বেড়ে-ওঠার আবহাওয়ার মধ্যেই সৃষ্টিশীলতার অঙ্কুর উপ্ত থাকবে; ছিলও। মামাই তাঁর মরমে স্ব-কে প্রকাশ করার মন্ত্র দিয়েছিলেন। সেই মন্ত্র ও মন্ত্রগুপ্তির সরণি ধরেই পরবর্তী জীবনে তিনি বারবার পৌঁছে গিয়েছেন বাংরিপোষি, ম্যাকলাক্সিগঞ্জ, মাড়ুমার, বেতলা-নেতারহাট-কোয়েলের গাঢ় বুকের কাছে। মূলত পূর্ব ভারতের বন-জঙ্গল, পশুপাখি ও আরণ্যক মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় ও অন্তরঙ্গ পরিচয়ের জেরেই বাংলাসাহিত্য পেয়েছে জঙ্গলের বিপুল এক মঙ্গলকাব্য। আর তিনি ক্রমে হয়ে উঠেছেন বিভূতিভূষণ-উত্তর নব্য বাংলাসাহিত্যের এক অনন্য ‘অরণ্যপুরুষ’।

শুধু তো জঙ্গলের নিবিড় উদ্ভিদ, ঝরাপাতা বনপল্লবের বর্ণগন্ধের ধারাপাতই নয়, তাঁর অরণ্য-পাঁচালির পরতে-পরতে মানুষের মেলাও কম আকর্ষণীয় নয়। হবে নাই-বা কেন! তথাকথিত সভ্য সমাজ থেকে দূরে কোনও অখ্যাত অনামা জনপদেই তো তিনি বারবার খুঁজে নিয়েছেন তাঁর ‘আত্মীয়’দের– চোখ বন্ধ করলেই তিনি দেখতে পান নাজিম সাহেব, কাড়োয়া, চাঁদুবাবু, আবু সাত্তার, বুধুয়াদের। এইসব মানুষের সঙ্গে তিনি একদা হেঁটেছেন মাইলের পর মাইল, খুঁজেছেন, খুঁজে নিয়েছেন প্রকৃতির দুয়ারে পড়ে-পাওয়া-চোদ্দো আনা।

বুদ্ধদেব গুহ-র প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘জঙ্গলমহল’। এর পর তাঁর কলম থেকে একে একে বেরিয়ে এসেছে ‘মাধুকরী’, ‘কোজাগর’, ‘চান ঘরে গান’, ‘বাংরিপোষির দু’রাত্রির’, ‘মাধুকরী’, ‘একটু উষ্ণতার জন্য’, ‘হলুদ বসন্ত’, ‘কোয়েলের কাছে’র মতো বিচিত্র আরণ্য-কথামালা। 

অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁকে ‘সব্যসাচী’ বলেছিলেন। কেননা বুদ্ধদেব একাধারে লেখক, গায়ক, বন্দুকবাজ, আঁকিয়ে আবার সফল চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টও–এক জীবনে কত কিছু! শোনা যায়, তাঁর গান শুনে মান্না দে একবার বুদ্ধদেবকে নাকি বলেছিলেন, আপনি তো প্রফেশনাল সিঙ্গারও হতে পারতেন। শোনা যায়, উত্তমকুমারের সঙ্গে অভিনয়ের সুযোগও এসেছিল বুদ্ধদেব গুহর; ঘটনাচক্রে ঘটে ওঠেনি। এক বনপালক বলেছিলেন, বুদ্ধদেবই একমাত্র সাহিত্যিক যাঁর উপন্যাস নতুন ‘টুরিস্ট স্পটে’র জন্ম দিয়েছে– বাংরিপোষি, মাড়ুমার, ম্যাকলাস্কিগঞ্জ।

অনেকে বলেন জনপ্রিয়তাই তাঁর সীমাবদ্ধতা। তা শুনে ‘ঋজুদা’ এবং ‘ঋভুদা’র স্রষ্টা বুদ্ধদেব একমুখ হেসে বলতেন– এটা তো ‘অক্সিমোরোন’ হয়ে গেল; জনপ্রিয়তা বরং আমার কাছে আশীর্বাদ! কিন্তু একজন লেখকের জীবনে তো শুধু আশীর্বাদই থাকে না। পুরস্কার, স্নেহ-ভালোবাসার পাশাপাশি, তিনি নিজমুখে উল্লেখ করেছেন প্রতীকী ‘থুতু’ এমনকি ‘লাথি’র কথাও! বলেছেন, এসবই তাঁর একান্ত স্মৃতির গোপন কক্ষে জমা হয়ে থাকছে তিস্তার কাকচক্ষু জলের মতো!

তিস্তার কাকচক্ষু জল! ঠিকই তো! এই কাকচক্ষু জলেই তো ছায়া ফেলেছে পালামৌ জঙ্গলে চৈত্রসন্ধ্যায় তাঁর প্রথম বাঘ-দেখার রোমাঞ্চ, দেবেশ রায়ের ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’-এর কাছে ‘মাধুকরী’র আপাত পরাজয়, সঞ্জীবচন্দ্র ও বিভূতিভূষণের ঐতিহ্য বহন করেও পাঠকের কাছে শেষ পর্যন্ত ‘ক্লাসে’ উত্তীর্ণ না-হওয়ার বোবা যন্ত্রণা।

‘হলুদ বসন্ত’ উপন্যাসের জন্য আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন। শরৎ পুরস্কারেও সম্মানিত হয়েছেন। তাঁর ‘বাবা হওয়া’ এবং ‘স্বামী হওয়া’-র উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে বাংলাছবি ‘ডিকশনারি’। এগুলি অবশ্য তাঁর শিল্পীসত্তার কাছে সামান্যই। তিনি যা পেয়েছেন, তা সব চেয়ে দুর্মূল্য। পাঠকের অপার আনুকূল্য। 

২০২১ সালের ২৯ অগাস্ট তাই একটা তারিখ মাত্র; লেখকের যাত্রা শেষ হয় না, বরং নতুন করে তা শুরু হয় তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই। 

(Zee 24 Ghanta App : দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির লেটেস্ট খবর পড়তে ডাউনলোড করুন Zee 24 Ghanta App)

আরও পড়ুন: Buddhadeb Guha: সাহিত্য জগতে ইন্দ্রপতন, প্রয়াত ‘ঋজুদা’ স্রষ্টা বুদ্ধদেব গুহ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

Afghanistan: US investigating civilian deaths in Kabul strike

Mon Aug 30 , 2021
“The President was informed that operations continue uninterrupted at HKIA (Kabul airport), and has reconfirmed his order that commanders redouble their efforts to prioritize doing whatever is necessary to protect our forces on the ground,” White House press secretary Jen Psaki said in a statement. Source link

Breaking News

Recent Posts