সমাবেশ হচ্ছে না বলে কি একটু আক্ষেপ থেকে যাচ্ছে না? জবাবে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সুব্রত বক্সী বলেন, ‘কর্মীদের মন খারাপের কিছু নেই। বাস্তব পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে এ বার সবার এই মানসিক প্রস্তুতি ছিল। আমাদের নেত্রী ভার্চুয়াল সভার মাধ্যমেই গোটা দলকে বার্তা দেবেন।’
প্রতিপক্ষের দুর্গ ভাঙতে ধর্মতলায় একুশের মঞ্চ থেকেই তৃণমূলনেত্রী আওয়াজ তুলেছিলেন, ‘ভাঙো, ভাঙো, ভাঙো’। সেটা ২০১০। উদ্বেল জনতাকে বসিয়ে রাখাই দায় হয়ে উঠেছিল। সে বার থেকেই একুশের মঞ্চ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। দিকে দিকে রটে যায়, ক্ষমতায় আসছেন মমতাই। ২০১১-র একুশে জুলাই ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে হয়েছিল তৃণমূলের বিজয়োৎসব। ২০১৩-র পঞ্চায়েত ভোটে বিলম্বের জন্য সমাবেশ করা যায়নি। পরের বছর ৩০ জানুয়ারি ফের ব্রিগেডেই সমাবেশ হয়েছিল। দু’একবার স্থানবদল হলেও ভিক্টারিয়া হাউসের সামনের জায়গাটিই একুশের স্থায়ী মঞ্চ হয়ে গিয়েছে। আর সেটাকে ভরকেন্দ্র করেই প্রত্যেক বছর এই তারিখে কলকাতা অবরুদ্ধ হয়েছে জনস্রোতে।
খেলার স্টেডিয়াম থেকে মেলার মাঠ–দিনচারেক ধরে শিবির করে রাখা হত দলের কর্মী-সমর্থকদের। ঘন ঘন সে-সব জায়গা পরিদর্শনে যেতেন শীর্ষনেতারা। সমাবেশের আগের সন্ধ্যায় সভাস্থলের চূড়ান্ত প্রস্তুতি দেখতে এসে সাধারণ কর্মীদের উৎসাহ জুগিয়ে যেতেন স্বয়ং মমতা। সংবাদমাধ্যম, পুলিশ-প্রশাসনেও দিনচারেকের বাড়তি তৎপরতা চোখে পড়ে এসেছে এতকাল। এ বার সেই সব চিরচেনা ছবি দেখছে না কলকাতা।
অস্থায়ী শিবিরে ডিম ভাজার ছবি নেই। হাওড়া, শিয়ালদহ, কলকাতা স্টেশনের বাইরে কর্মীদের স্বাগত জানাতে তৈরি হয়নি ক্যাম্প-অফিস। কলকাতার রাজপথে ডালা পেতে বসে নেই ছবিওয়ালার দল। যাঁরা প্রত্যেক বছর একুশের আগে থেকেই তৃণমূলনেত্রীর ফটোফ্রেম থেকে শুরু করে ঘাসফুল চিহ্নের চাবির রিং, টি শার্টের পসরা নিয়ে বসে পড়েন বিক্রির আশায়। প্রতি বছর সভাস্থলের আশপাশে ঘাসফুলের টুপি, মুখোশ পরে চক্কর কাটতে দেখা যায় মমতা-ভক্তদের। এ বার তাঁরাও সব বুথে-বুথেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
অন্য বারের মতো ধকল নেই নেতাদেরও। রাত জাগা, দৌড় ঝাঁপ না-থাকায় খানিকটা খারাপই লাগছে অনেকের। যেমন দলের উত্তর ২৪ পরগনার জেলা সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। তাঁর কথায়, ‘গ্রামাঞ্চল থেকে কর্মীদের কলকাতা নিয়ে আসা থেকে শুরু করে সমাবেশের পর বাড়ি পাঠানো–যে দায়িত্ব থাকে, সেটা চরম আনন্দের। ওটা খুব মিস করছি।’ সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মতো সত্তরোর্ধ নেতা বলছেন, ‘যুক্তি আর মন খারাপের সমন্বয় হলে যে অনুভূতিটা হয়, আমাদের ঠিক সেটাই হচ্ছে এ বার। কী আর করব, গড়িয়াহাটের ব্রিজের তলায় বসেই কর্মীদের নিয়ে মমতার বক্তৃতা শুনব।’
২১ জুলাইয়ের সমাবেশে তৃণমূলনেত্রীর বক্তৃতার আগে সুমন-নচিকেতার গান যেমন বিশেষ আবহ রচনা করেছে বহু বার, ঠিক তেমনই প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘আমি বাংলার গান গাই’ও একুশের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। এ বার সমাবেশ হচ্ছে না। শিল্পী-সমাবেশও দেখা যাবে না। তবে বুথে-বুথে বাজবে মমতার লেখা গান ‘যৌবন জাগো নতুন ভোরে।’