মঙ্গলবার লেবাননের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৭ মিনিটে ওই বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের অভিঘাতে গোটা শহর কেঁপে ওঠে। ২৪০ কিলোমিটার দূর থেকেও টের পাওয়া যায় কম্পন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজাধানীর ৪০ শতাংশ ঘরবাড়ি।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় নিউজ এজেন্সি এনএনএ’র উল্লেখ করে আল জাজিরা জানাচ্ছে, বন্দরের ১৬ কর্মীকে গ্রেফতার নয়, আটক করা হয়েছে। এই ১৬ বন্দরকর্মীকে হেফাজতে নিয়ে জিগ্যাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বেইরুটের সামরিক প্রসিকিউটর ফাদি আকিকি।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, রাজধানীর বন্দরের ১৮ জন স্টাফকে তদন্তের কাজে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে আনা হয়েছিল। এদের মধ্যে ১৬ জন এখনও নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে আছেন। তদন্তের স্বার্থে তাঁদের হেফাজতে রাখা হয়েছে। আটকদের মধ্যে বন্দর ও কাস্টমসের বেশ কয়েক জন কর্তাও রয়েছেন। বেইরুট বিস্ফোরণে সন্দেহভাজন বেশ কয়েক জন কর্তাকে আগেই গৃহবন্দি করার নির্দেশ দেয় সরকার।
মঙ্গলবার রাজধানীর বন্দর এলাকায় জোড়া বিস্ফোরণে এখন পর্যন্ত ১৫৭ জনের প্রাণহানির খবর জানা গিয়েছে। আহতের সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি। ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে এখন পর্যন্ত গুদামে অসুরক্ষিত ভাবে মজুদ করে রাখা ২ হাজার ৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটকে দায়ী করা হচ্ছে। যদিও এ বিষয় শতভাগ নিশ্চিত রিপোর্ট আসেনি এখনও।
লেবাননের বিদেশ মন্ত্রী চার্বেল ওয়েহবে ইউরোপ ১ রেডিও চ্যানেলকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, মঙ্গলবারের ওই ভয়াবহ বিস্ফোরণে দোষীদের খুঁজে বের করতে বৃহস্পতিবার সকালে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সর্বোচ্চ চার দিনের সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। এত বড় ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে কারা দায়ী, সে বিষয়ে তদন্ত করা হবে। বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবারের সেই বিস্ফোরণের তাণ্ডবে বেইরুট শহরের প্রায় অর্ধেক ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। বিস্ফোরণের প্রভাব এতটাই তীব্র ছিল যে ১৫০ কিলোমিটার দূরের দেশ সাইপ্রাসও কেঁপে উঠেছিল। বিস্ফোরণের ধাক্কায় ৪ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো কম্পন সৃষ্টি হয়েছিল রাজধথানী শহরে।
বিস্ফোরণের তীব্রতায় ঘটনাস্থল থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের সেন্ট্রাল বৈরুতের বাড়িঘর, গাড়ির কাচ ভেঙেছে। এ ঘটনাকে ‘প্রাকৃতিক বিপর্যয়’ আখ্যা দিয়েছেন দেশটির সাংবাদিক হাবিব বাত্তাহ। ঘটনার পর দিনই দেশব্যাপী জাতীয় শোক দিবস পালন করে লেবাননের সরকার।
বিস্ফোরণে লেবাননের মজুদ খাদ্যশস্যের ৮৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে খাদ্যসংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ দেশটি আমদানিকৃত খাদ্যশস্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। খাদ্যশস্যের এখন যা মজুদ আছে, তা দিয়ে দেশটি বড়জোর আর এক মাস চলতে পারবে। খবর এএফপি ও গার্ডিয়ানের।
লেবাননের রাজধানীতে বিস্ফোরণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে বলে সেখানকার গভর্নর মারওয়ান আবুদ জানিয়েছেন।
বৈরুতে ভয়াবহ এ বিস্ফোরণে নতুন করে কোনো বাংলাদেশীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। গতকাল লেবাননে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে জানা গেছে, ওই বিস্ফোরণের পর থেকে দুই বাংলাদেশীর খোঁজ মিলছে না। নিখোঁজ দুই প্রবাসী কর্মীর সহকর্মীরা দূতাবাসে এসে ওই তথ্য দিয়েছেন।
এদিকে লেবাননে বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল আরো দুই বাংলাদেশী আহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে গতকাল পর্যন্ত ১০৬ জন বাংলাদেশী আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৮৫ জন প্রবাসী কর্মী ও ২১ জন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য। বৈরুতের বন্দরের কাছে ওই বিস্ফোরণে চারজন প্রবাসী কর্মী মারা গেছেন। দেশটিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের কাজে যুক্ত থাকায় বৈরুত বন্দরে উপস্থিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’-এর ক্ষতি হয়েছে।
আরও পড়ুন: লেবাননে বিস্ফোরণের ঘটনায় বৈরুত বন্দরের ১৬ কর্মী আটক
মঙ্গলবারের ওই বিস্ফোরণে বৈরুত শহরের অর্ধেক অংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন গভর্নর।
এদিকে, ওই গুদামে যে বিস্ফোরণ হতে পারে, সে বিষয়ে অনেক আগে সতর্ক করা হলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। লেবাননের সরকারি কর্তারা বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেছেন, চাইলে এ দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। কারণ এর আগে বেশ কয়েক বার বিস্ফোরণের ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।
২০১৪ সাল থেকে এই অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বন্দরে পড়ে রয়েছে। ছয় মাস আগেও গুদামটি পরিদর্শন শেষে সতর্ক করা হয়েছিল। লেবাননের কাস্টমস প্রধান বাদ্রি দাহের বলেন, তার সংস্থা গুদাম থেকে ওই রাসায়নিক পদার্থগুলো সরিয়ে ফেলার জন্য তাগাদা দিলেও কোনও কাজ হয়নি। পূর্ব সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট সরিয়ে না-নেওয়ায় লেবাননে সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ বাড়ছে।
মঙ্গলবার বিস্ফোরণের পর যে কমলা রঙের ধোঁয়ার মেঘ রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেটি নাইট্রেটের বিস্ফোরণের কারণে হয়েছে বলে মত বিশ্লেষকদের। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মঙ্গলবারের মতো ভয়াবহ বিস্ফোরণ লেবানন এর আগে দেখেনি।
ব্রিটেনের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের ধারণা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমায় ফেলা পারমাণু বোমার শক্তির ১০ ভাগের এক ভাগ বেইরুটের বিস্ফোরণে দেখা গিয়েছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইরান, ইসরায়েল ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে লেবাননকে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এই সময় ডিজিটাল এখন টেলিগ্রামেও। সাবস্ক্রাইব করুন, থাকুন সবসময় আপডেটেড। জাস্ট এখানে ক্লিক করুন।
