Dhritiman Chaterji: নিজস্বতা, দক্ষিণপন্থী তরঙ্গ এবং ধৃতিমান – exclusive interview of dhritiman chatterjee

করোনার আবহে তিনি গোয়ার বাড়িতে এখন। বহুদিন পরে সংবাদমাধ্যমের সামনে সত্যজিৎ এবং মৃণালের এক প্রিয় অভিনেতা ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়। সিনেমা ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনায়। ফোনে তাঁকে ধরলেন ভাস্বতী ঘোষ

শহর কলকাতার বিশপ লেফ্রয় রোড ধরে হাঁটলে দেখা যেত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ঘরের জানলা খোলা রয়েছে কিনা। বসার এই ঘরে চিত্রনাট্য লিখতেন, ছবি আঁকতেন সত্যজিৎ। ঘরের জানলা বন্ধ থাকলে বুঝে নিতে হতো, তিনি কাজে ব্যস্ত। বা খাওয়াদাওয়া করছেন। না হলে রায় বাড়িতে অবারিত দ্বার। আড্ডার জন্য। এমন বহু আড্ডায় থেকেছেন অভিনেতা ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়। সত্যজিতের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ বা ‘গণশত্রু’র ধৃতিমান। আবার পরিচালক মৃণাল সেনের ‘পদাতিক’ বা ‘আকালের সন্ধানে’র ধৃতিমান। বুদ্ধিজীবী বাঙালির প্রিয় অভিনেতা।

বয়স ৭৫। খুব বেশি কথা বলতে উপভোগ করেন না আজকাল। বরাবরই নির্বাচিত ছবির অংশ হওয়ায় বিশ্বাসী। শুটিং থাকলে সল্টলেক বা মুম্বইয়ের বাড়িতে থাকেন। এখন আছেন গোয়ার বাড়িতে।

আপাতত কোনও শুটিং শুরু করতে চান না, করোনা এড়াতে সিনিয়র অভিনেতাদের বেশি সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে বলে।

তাঁর অপেক্ষায় মুম্বইয়ের দু’টি প্রোজেক্ট থমকে। একটা সিনেমার, একটি টিভি সিরিজ।

অতিমারী তাঁকে কী শেখাল? গোয়া থেকে ফোনে ধৃতিমানের উত্তর, ‘সপ্তদশ শতকে প্লেগ এরকম একটা সময় নিয়ে এসেছিল। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে স্প্যানিশ ফ্লু হয়েছিল। তবে আমরা এমন সময় প্রথমবার প্রত্যক্ষ করছি। আমার কাছে এটি সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। ডাউনসাইডে যেমন মৃত্যুভয়, চাকরি চলে যাওয়ার মতো কিছু জিনিস রয়েছে, তেমনই আপসাইড আছে। গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যাবে, এই অভিজ্ঞতা কতটা মূল্যবান’। করোনার অভিজ্ঞতার আপসাইড কী, জানতে চাইলে তাঁর উপলব্ধি, ‘এটা নতুন অভিজ্ঞতা। যা আগে হয়নি। পরেও হবে না আশা করছি। এই অভিজ্ঞতা জীবনের খুঁটিনাটিকে অন্য আঙ্গিকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। সে কারণেই মূল্যবান মনে হয়’।

দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে তাঁর কী মত? ধৃতিমান জোর গলায় বলেন, ‘রাজনীতিতে উত্তাল সময় আমি কলেজ জীবনে দেখেছি। তখন সাংঘাতিক বামপন্থী একটা তরঙ্গ ছিল। এখন যে উত্তাল সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি, সেখানে ভয়ঙ্কর দক্ষিণপন্থী একটা তরঙ্গ বইছে। আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয় এই দক্ষিণপন্থী, অগণতান্ত্রিক তরঙ্গ। তবে এ গুলো আসবে যাবে। যদি মনে হয় মত প্রকাশ করা দরকার, সেটা করা যেতে পারে। না হলে মানুষ হিসেবে সৎ থাকার চেষ্টা করতে হবে’।

‘গণশত্রু’ আজ চূড়ান্ত প্রাসঙ্গিক। সত্যজিতের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে আলোচনার সময় পরিচালকের কোন ভাবনা উঠে আসত? নস্টালজিক ধৃতিমান খোলসা করেন, ”গণশত্রু’ করার আগে উনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছবিটার শুটিংয়ের সময় সর্বক্ষণ সেটে অ্যাম্বুলেন্স থাকত। ওঁর কার্ডিওলজিস্ট আসতেন। সে সময় সাপের দুধ খাওয়ার মতো কিছু ঘটনা ঘটে। দক্ষিণপন্থী আভাস মাথাচাড়া দিতে শুরু করে। উনি আমাকে বলেছিলেন, এর বিরুদ্ধে ওঁর কিছু বলার আছে। সে কারণে ইবসেনের নাটকটাকে ভিত্তি করে ‘গণশত্রু’-র মধ্যে শাপের দুধ খাওয়া, পবিত্র জল কখনও নষ্ট হতে পারে না, এই বিষয়গুলো এনে ফেলেছিলেন।’ তাঁর পরের বিশ্লেষণ, ‘মৃণাল সেন আমার আর এক প্রিয় পরিচালক। তিনি যেমন প্রত্যক্ষভাবে বার্তা দিতে পছন্দ করতেন, মানিকদা তেমন নন। পরোক্ষভাবে বার্তা দেওয়া ওঁর সিগনেচার ছিল’।

ধৃতিমান তিরিশ বছরের ব্যবধানে সত্যজিতের সঙ্গে দু’টো ছবি করলেও যোগাযোগ ছিল নিবিড়। হুট করে বাড়িতে পৌঁছে গেলে আড্ডা হতো অ্যানথ্রোপোলজি থেকে লোডশেডিং নিয়ে। তখন লোডশেডিং ছিল প্রায় রাজনৈতিক একটি সমস্যা। আবার সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় শঙ্কু হয়েছেন অভিনেতা। কতটা সফল হল এই ছবি? ‘অনেক দর্শক ছবিটা দেখেছেন, সেটা একটা দিক। তবে যেটা গুরুত্বপূর্ণ, অনেকেই আমাকে জানিয়েছেন, এই ছবি দেখে শঙ্কু চরিত্রটার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে নতুন প্রজন্মের, তারা শঙ্কু পড়তে শুরু করেছে। কারণ ইদানীং নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের সাহিত্যের সঙ্গে যোগাযোগ ক্ষীণ। কিছু সমালোচনাও হয়েছে ছবিটার। যেমন শঙ্কু এত সফিসটিকেটেড কীভাবে? বা এত ভালো ইংরেজি বলে কী করে? তার পাল্টা যুক্তি অবশ্য রয়েছে। সামগ্রিকভাবে শঙ্কু গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, সেটা মনে হয়’, জবাব অভিনেতার।

৫০ বছর ধরে ছবির জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা নিংড়ে তাঁর কি মনে হয় বাংলা ছবির মান পড়ছে? ধৃতিমানের স্পষ্ট কথা, ‘ছবির মান পড়েছে কিনা এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ সমাজ পালটেছে। সিনেমা এখন বিনোদনের আর একমাত্র মাধ্যম নয়। তাই বাংলা ছবির পরিচালকরা নিজেদের মতো করে লড়াই করছেন। নতুন ভাবনা ভাবার চেষ্টা করছেন। তবে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, তপন সিংহ, তরুণ মজুমদার, অজয় কর বা অসিত সেন এঁদের সকলের ছবির মধ্যে সমকালীন সমাজের প্রতিফলন থাকত। কেউ প্রত্যক্ষ রাজনীতি নিয়ে ছবি করেছেন। আবার কারও ছবিতে পরোক্ষভাবে সমাজ সচেতনতা এসেছে। গ্রাম বাংলা থাকত।’ একটু থেমে আরও গভীরে যান ধৃতিমান, ‘সবচেয়ে বড় কথা এঁদের নিজস্বতা ছিল। যে নিজস্বতা সিগনেচার হয়ে গিয়েছিল। যেমন সত্যজিতের সব ছবিতে সমাজভাবনা ছিল। নিছক গল্প বলার জন্য উনি কোনও ছবি করেননি। এখনকার বাংলা ছবিতে সেই নিজস্বতা হারিয়ে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক ছবির জগতেও বাংলা ছবির স্বীকৃতি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। এখনকার যাঁরা কৃতী পরিচালক, তাঁদের অনেকে হয়তো আত্মতুষ্টিতে ভোগেন। অনেক সময় তাঁদের মধ্যে উচ্চাশার অভাব টের পাই’।

ধৃতিমানের এ সব মূল্যবান উপলব্ধি আসলে জানিয়ে দেয়, লকডাউনের হয়তো প্রয়োজন ছিল। বিরতির প্রয়োজন ছিল। অনেকটা ভাবনার প্রয়োজন ছিল।

যে ৫ ছবি করে সবচেয়ে তৃপ্ত

১। প্রতিদ্বন্দ্বী

২। আকালের সন্ধানে

৩। শূন্য থেকে শুরু

৪। চিত্রকর

৫। ৩৬ চৌরঙ্গি লেন

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

Electrical Brain Stimulation Offers Hope Against Dyslexia

Sat Sep 12 , 2020
By Amy NortonHealthDay Reporter THURSDAY, Sept. 10, 2020 (HealthDay News) Electrical stimulation of a sound-processing area of the brain can briefly improve reading skills in adults with dyslexia, a new, small study has found. Researchers say their results suggest that deficits in that brain region are a cause of the […]

You May Like

Breaking News

Recent Posts