বন্যায় প্রাণ বাঁচলেও খাবারের টান পড়েছে। বন্যার জলে ডুবে গিয়েছে কাজিরাঙার ঘাসের জমি। জল নামা না পর্যন্ত সেই জমিতে আবার নতুন করে ঘাস গজানো অসম্ভব। কিন্তু জল নামছে কই। দিনে দিনে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে উঠছে। হাতি, হরিণ কাজিরাঙা ছেড়ে করবি আংলংয়ের পাহাড়ি এলাকায় পারি দিয়েছে। বন্যার হাত থেকে বাঁচতে ও খাবারের আশ্রয় নিয়েছে উঁচু জায়গায়। অসমে ভয়ংকর বন্যার ভয়ংকর রেকর্ডগুলির মধ্যে ১৯৯৮ তো রয়েছেই, ২০১৭, ২০১৯ ও ২০২০- এই তিনবছর পর পর ভয়াবহ বন্যার সম্মুখীন হয়েছে অসম।
ক্রমশ অবনতি হচ্ছে অসমের বন্যা পরিস্থিতি, মৃত বেড়ে ৯৬
কাজিরাঙা ন্যাশনাল পার্কের ৯৫ শতাংশই জলের নীচে। তার ফলে শুধু মানুষ নয়, বানভাসী পরিস্থিতি বন্যপ্রাণীরও। ৪৩০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়ানো এই ন্যাশনাল পার্কের বেশিরভাগটাই জলের নীচে ডুবে যাওয়ায় প্রাণ হারিয়েছে বহু বন্যপ্রাণী। বন্যার জীবন বিপন্ন দেখে জঙ্গলের ৯০ শতাংশ হরিণ পাহাড়ি এলাকায় চলে গিয়েছে।
কাজিরাঙা ডিএফও রমেশ গগৈ জানিয়েছেন, ‘ভয়ংকর বন্যাতেও পশুরা মানিয়ে নিতে পারে। কিন্তু এ বছরের অবস্থা অন্য বছরের থেকে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এক বছরেই বহুবার বন্যার আঘাত সহ্য করে চলেছে কাজিরাঙা জাতীয় অভয়ারণ্য। জঙ্গলের সব তৃণভমি এখনও জালের তলায়।’
তিনি এও জানান, ‘গণ্ডার ও বন্য মোষ শুধুমাত্র তৃণ খেয়েই বেঁচে থাকে। ওটাই ওদের খাদ্য। বন্যায় সব ডুবে যাওয়ায় তাদের খাবারের অনেক ঘাটতি দেখা গিয়েছে। অন্যদিকে হরিণের জন্য দরকার তাজা ঘাস। সব মিলিয়ে বনদফতরের চিন্তা আরও বেড়ে গিয়েছে।’
অসমে বন্যা: ভেসে যাওয়া কাজিরাঙায় ছাগলের কাছে আশ্রয় নিল বাঘ!
গগৈ জানিয়েছেন,’ কাজিরাঙার এখন সবচেয়ে আগে যেটি দরকার সেটি হল পুনরায় ঘাসের জমি তৈরি করা। কিন্তু সেই জমি ও তৃণ উত্পাদন বাড়ানোর জন্যও দরকার শুষ্ক জমি। কিন্তু পর পর তিন বছর ক্রমাগত বন্যায় সেই ঘাটতি কিছুতেই পূরণ করা সম্ভন হচ্ছে না।’
বৃহস্পতিবার কাজিরাঙা অভয়ারণ্য থেকে একটি রিপোর্ট সামনে আনা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, জঙ্গলের ৬০ শতাংশ জলের তলায় ডুবে রয়েছে। এখনও পর্যন্ত ১৪৩টি পশু মারা গিয়েছে। তার মধ্যে হরিণই মারা গিয়ে ১০৪টি। অন্যদিকে, বন্যার জলে ডুবে মারা গিয়েছে ৫০টি পশু ও গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর চোট পেয়ে মারা গিয়েছে ১৮টি।
বন্যায় হারিয়ে গিয়েছে মা, ভেসে যাওয়া গন্ডার শাবককে বাঁচাল অসমের গ্রামবাসীরা!
তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘যে সব পশুরা নিজে থেকেই জঙ্গল ছেড়ে পার্বত্য এলাকার দিকে চলে যাচ্ছে তাদের যাতায়াতের পথে যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, তার জন্য সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা। হাইওয়ে পার করে অনেক পশু অন্যত্র চলে যাচ্ছে, সেখানেও আমরা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি।’
পশুবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ক্রমাগত বন্যা জাতীয় উদ্যানটিকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিচ্ছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়ার যুগ্ম প্রধান রথিন বর্মন জানিয়েছেন, ‘এখনই কৃত্রিম উপায়ে কোনও বিকল্প করা সম্ভব নয়। কৃত্রিম খাবারের কারণে পশুদের ব্যবহারের মধ্যে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাবে। একমাত্র সমাধান হতে পারে যদি কয়েক ঘন্টায় আটকে পড়া পশুদের উদ্ধার করে মুক্ত বনাঞ্চলে ছেড়ে দেওয়া যায়।’
বন্যা-করোনার মধ্যে শাঁখের করাতে দুর্গতরা
কাজিরাঙা উদ্যানের ডিরেক্টর পি শিবাকুমারের বক্তব্য,’ কাজিরাঙা ছেড়ে বন্যপ্রাণীরা করবি আঙলংয়ের দিকে চলে যাচ্ছে। গত দুমাসে তিনটি পশু করিডরের ৫০০ হেক্টর জমি যোগ করেছি। কাজিরাঙার মোটি নয়টি করিডর। কিন্তু তারমধ্যে ৬টি করিডরের জমি পড়ে রয়েছে জমি সমস্যা নিয়েই। যেগুলি খুব তাড়াতাড়ি সমস্যা মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছি।’
‘ক্রমশ বন্যা পরিস্থিতি ভয়ংকর আকার ধারণ করছে। প্রতিবছর বন্যা লেগেই রয়েছে অসমে। তবে আমাদের হাত-পা বাঁধা। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হল করিডরের সমস্যা সমাধান করা। কিন্তু সেগুলি করা এখনই সম্ভব নয়। যদি নির্মাণ করতেই হয়, তাহলে সেগুলি পাহাড়ি এলাকায়। আমাদের কিছু সীমা রয়েছে। নদীর জল বেড়ে যাওয়ায় শুকনো সব জায়গা এখন ডুবে গিয়েছে। এখনই সব সমতল ও শুষ্কজমি বন্যপ্রাণীদের পাহাড়ি এলাকায় স্থানান্তরিত করা সম্ব নয়। বন্যা তো রয়েছেই, ভারী বৃষ্টিতে চলছে ভূমিধস। এছাড়া নতুন জায়গায় গেলেই এখন অন্য সাবধানতাও অবলম্বন করতে হবে। করোনার কালবেলায় এখন সারা বিশ্বই ত্রস্ত!’
এই সময় ডিজিটাল এখন টেলিগ্রামেও। সাবস্ক্রাইব করুন, থাকুন সবসময় আপডেটেড। জাস্ট এখানে ক্লিক করুন-https://t.me/EisamayNews